লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য


ইংরেজরা যখন তাদের শিক্ষা-সভ্যতা এবং খ্রীস্টীয় মতবাদ-এর ব্যাপক প্রচার-প্রসার শুরু করলো এবং মুসলিম যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে মহামারির মত তার প্রভাব বিস্তার শুরু হয়ে গেল। উপরন্তু মুসলিম সমাজের মধ্যে পীর পূজা ও মাজার পূজাসহ নানা রকম বিদআত ও জাহেলিয়্যাতের ঈমান বিধ্বংসী কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটলো, তখন মুসলমানদের ঈমান, আমল, তাহযীব, তামাদ্দুন, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি, কুরআন-সুন্নাহর মূল আদর্শ তথা ইসলামী শরীয়তের হিফাযতের চেষ্টায় এবং কুফর ও শিরক, বিদ্আত ও গুমরাহী উৎখাতের মহান লক্ষ্যে একদল আত্মত্যাগী অগ্রসেনানী তৈরীর নিমিত্তে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পূর্ব বাংলার মুসলিম অধ্যুষিত চট্টগ্রাম জেলায় হাটহাজারীর প্রাণকেন্দ্রে গড়ে তোলা হয় বাংলার ক্বওমী মাদ্রাসাসমূহের জননীরূপে খ্যাত দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটি। বাংলার কয়েকজন দ্বীনে মুহাম্মদীর মশালধারী, উম্মতে মুহাম্মদীর পথপ্রদর্শক, হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী (রাহ্.)এর হাতে গড়া মর্দে মুজাহিদ শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ্ (রাহ্.) এবং ওলীয়ে কামেল হযরত মাওলানা ফযলে রহমান গঞ্জেমুরাদাবাদী (রাহ্.)এর খিলাফতপ্রাপ্ত আশেকে কুরআন হযরত মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ (রাহ্.), মুনাযিরে আযম মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আব্দুল হামীদ (রাহ্.) এবং হাদিয়ে মিল্লাত হযরত মাওলানা সফী আযীযুর রহমান (রাহ্.) প্রমুখের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রম ও ভোর রাতের আহাজারীর বরকতেই এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বহুমুখী দ্বীনি খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। এই মহামনীষীগণের সামনে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীগণ (রাযি.)এর জীবনী ছিল একমাত্র আদর্শ। আল্লাহর উপর মজবুত ঈমান ও বিশ্বাস ছিল তাঁদের চলার পথে একমাত্র পাথেয়। সর্বোপরি তাঁদের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল নিসবতে নববীর উপর রচিত। তাই তো দারুল উলম হাটহাজারী থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার আলেম তৈরী হয়ে বিশ্বের আনাচে-কানাচে দ্বীনের বহুমুখী কাজে ব্রত রয়েছেন। যে সকল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আমাদের আকাবিরগণ দারুল উলূম হাটহাজারী প্রতিষ্ঠা করেন, তা নিম্নে তুলে ধরা হল-

দারুল উলূম হাটহাজারী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলী:

(১) ইলায়ে কালিমাতুল্লাহ, অর্থাৎ- দাওয়াত ও তাবলীগ, তালীম, তাআল্লুম তথা মুজাহাদা ও জিহাদ ফী ছাবীলিল্লাহ মাধ্যমে আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করা এবং এই উদ্দেশ্যে মর্দে মুজাহিদ তৈরী করা।

(২) এহ্ইয়ায়ে সুন্নাত ও ইমাতাতে বিদআত তথা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর যাবতীয় সুন্নাতের প্রচার, প্রসার এবং সকল বিদআত ও রসুমাতকে (কুপ্রথা) মিটিয়ে দেয়া।

(৩) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)এর পূর্ণ নীতি ও আদর্শের উপর ভিত্তি করে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু এবং তদানুযায়ী পাঠ্য তালিকা প্রণয়ন করা। অর্থাৎ কুরআন হাদীস ও আকাঈদের বিষয়াবলীর যুক্তিসিদ্ধ ব্যাখ্যা এবং এ সম্পর্কীয় সকল প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ শিক্ষা দেয়া।

(৪) এমন একটি কাফেলা সৃষ্টি করা, যাদের ক্ষুরধার লেখনী, জ্বালাময়ী অনলঝরা বক্তব্য ইসলামের সঠিক অনুভূতির পুনর্জাগরণে এবং হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুপম আদর্শ তথা ইসলামী তাহযিব-তামাদ্দুন সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সঠিক বাস্তবায়নে সক্ষম হবে। এরই ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানবতা খুঁজে পাবে হিদায়াতের সঠিক ও সহজতর পথ।

(৫) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আক্বীদা হানাফী মাযহাব, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রাহ্.)এর দৃষ্টিভঙ্গী, হযরত মাওলানা শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্ (রাহ্.)এর চিন্তাধারা, হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গুহী (রাহ্.), হযরত মাওলানা কাসেম নানুতুভী (রাহ্.) ও হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রাহ্.)এর আত্মশুদ্ধির পদ্ধতি ও উপদেশাবলী, শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমদুল হাসান দেওবন্দী (রাহ্.) ও শাইখুল আরব ওয়াল আযম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রাহ্.)এর সংগ্রামী জীবন দর্শনকে সামনে রেখে তদনুসারে (দারুল উলূম দেওবন্দের ন্যায়) একটি আদর্শ ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলা।

দারুল উলূম হাটহাজারীর মূলনীতি:

দারুল উলূম দেওবন্দের মূলনীতি, যা উসূলে হাশতেগানা নামে অভিহিত, তা-ই দারুল উলূম হাটহাজারীর মূলনীতি হিসেবে গৃহীত। যথা-

(১) মাদ্রাসার শিক্ষক কর্মচারীগণ সর্বদাই সাধ্যানুযায়ী অধিকতর জনসাধারণের মুক্তহস্তের দান সংগ্রহের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবেন। এতে অপরকেও উৎসাহিত করবেন। দারুল উলূম হাটহাজারীর হিতাকাংখী ও শুভানুধ্যায়ীগণও এ কথা সর্বদাই স্মরণ রাখবেন।

(২) ছাত্রভর্তি ও ছাত্রদের খাদ্য যোগানের ব্যাপারে মাদ্রাসার শুভাকাংখীগণ সব সময় চেষ্টা করবেন।

(৩) পরামর্শদাতাগণ সর্বদা মাদ্রাসার উন্নতি, অগ্রগতি ও স্থায়িত্বের প্রতি সজাগ দৃষ্টি দিবেন এবং মাদ্রাসার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য বাস্তবায়নে সঠিক পরামর্শদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজ মতামতের পরিপন্থী হলেও সম্মতি দেবেন। যদি স্বীয় মতামতের বিপক্ষে হওয়ার দরুণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরোধিতা করা হয়, তবে মাদ্রাসার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। মুহ্তামিম সাহেব মাদ্রাসার ভিতরের বা বাইরের পরামর্শদাতাগণের নিকট থেকে পরামর্শ গ্রহণ করবেন। কোন কারণে সবার পরামর্শ গ্রহণে অপারগ হয়ে মাত্র কয়েকজনের পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য হলে মুহ্তামিম সাহেবের উপর অন্য পরামর্শদাতাগণের অসন্তুষ্ট না হওয়া বাঞ্ছনীয়।

(৪) শিক্ষকমন্ডলী পরস্পর একতাবদ্ধ থাকা অত্যন্ত জরুরী। একে অপরকে হেয় প্রতিপন্ন না করা এবং অহংকারবোধ পরিহার করা উচিত। যখন অন্যকে হেয় করা হবে এবং অহংকারবোধ দেখা দেবে, তখন মাদ্রাসার সার্বিক উন্নতি ব্যাহত হবে।

(৫) ক্লাসের পূর্বনির্ধারিত পাঠ্য তালিকা দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকগণের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা অতীব জরুরী। যদি তা না করা হয়, তবে মাদ্রাসার লেখাপড়ার মানের উন্নতি হবে না। বাহ্যিক উন্নতি হলেও ফলপ্রসূ হবে না।

(৬) যতক্ষণ পর্যন্ত মাদ্রাসার কোন স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকবে, ততক্ষণ আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হয়ে চলবে। যদি মাদ্রাসার স্থায়ী আয় সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়, অর্থাৎ দোকান, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, কারখানা, ব্যবসা ও কোন ব্যক্তি বিশেষের নিয়মিত দানের প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি থাকে, তবে আল্লাহ্ তাআলার উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাওয়ার আশংকা রয়েছে। এতে করে অদৃশ্য সাহায্য স্থগিত হয়ে যাওয়ার আশংকা এবং কর্মকর্তাদের মাঝে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে। মোটকথা আয়-ব্যয়ের ব্যাপারে বাহ্যিক সহায়-সম্বলের প্রতি একরকম অনাসক্তভাব থাকতে হবে এবং আল্লাহ তাআলার উপর পূর্ণ নির্ভরশীল থাকতে হবে।

(৭) উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তার প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের প্রভাব দেখানো মাদ্রাসার জন্য ক্ষতির কারণ বলে গণ্য হবে।

(৮) শর্তহীন দানই হচ্ছে এ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও টিকে থাকার প্রধান সহায়।